শাল্লায় হাওর রক্ষা বাঁধে অনিয়মের অভিযোগ বৈধ পিআইসি বাতিল, ‘পকেট কমিটি’ গঠন — খুনের আসামি নেতৃত্বে! ক্ষোভে ফুঁসছেন কৃষকরা

আইন-অপরাধ আরো পরিবেশ সারাদেশ সিলেট
শেয়ার করুন...

এম আর সজিব,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে নজিরবিহীন প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম মেনে প্রকল্পের বড় অংশ সম্পন্ন করার পরও রহস্যজনকভাবে ১২২ ও ৭১ নম্বর পিআইসি’র (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) কার্যাদেশ বাতিল করায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
অন্যদিকে ৭০ নম্বর পিআইসিতে জমিহীন ব্যক্তি এবং হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিকে নেতৃত্বে আনার অভিযোগে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ছায়ার হাওড় উপ-প্রকল্পের আওতায় জগন্নাথপুর হতে বিষ্ণুপুর নতুনহাটি (১২২ নম্বর) এবং বিষ্ণুপুর নতুনহাটি থেকে সেচ পাম্প পর্যন্ত (৭১ নম্বর) পিআইসি গঠন করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত এসব কমিটি বৈধ কার্যাদেশ পেয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দ্রুত কাজ শুরু করে।
১২২ নম্বর পিআইসি’র সদস্য রাধাগোবিন্দ দাস জানান, তারা ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ মাটির কাজ সম্পন্ন করেছেন। একইভাবে ৭১ নম্বর পিআইসি’র সদস্য প্রসেনজিত দাস বলেন, তাদের প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
কিন্তু কোনো লিখিত কারণ ছাড়াই হঠাৎ শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী মৌখিকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের একটি মহল এই বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ৭০ নম্বর পিআইসি গঠন নিয়ে। কৃষক শনিলাল দাসের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, কমিটির সদস্য সচিব রাজেন্দ্র চন্দ্র দাসের প্রকল্পের আওতায় কোনো জমি নেই। অন্যের জমি বা বিক্রিত সম্পত্তির ভুয়া খতিয়ান দেখিয়ে তিনি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
এছাড়া কমিটির সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাস উত্তরা পূর্ব থানায় দায়েরকৃত একটি হত্যা মামলার (মামলা নং-১৩, তারিখ: ২৬/০৯/২০২৪) এজাহারভুক্ত আসামি বলেও অভিযোগ রয়েছে। একজন চিহ্নিত আসামি কীভাবে হাওর রক্ষা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেলেন তা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। গত ৮ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও কৃষকরা তার সাক্ষাৎ পাননি।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়ার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
শাল্লা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হক বলেন,
“আমরা নীতিমালার আলোকে কাজ করছি। ১২২ ও ৭১ নম্বর পিআইসি’র কাজে কিছু কারিগরি ত্রুটি ও স্থানীয় বিরোধের কারণে কাজ বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে।”
তবে কাজ চলাকালীন কার্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিকতা সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলেন, পিআইসি গঠনে অনিয়ম সুনামগঞ্জে নতুন নয়; কিন্তু চলমান প্রকল্প বাতিল এবং হত্যা মামলার আসামিকে দায়িত্ব দেওয়া নজিরবিহীন। দ্রুত তদন্ত না হলে ছায়ার হাওরের হাজার হাজার একর বোরো ফসল আসন্ন বর্ষায় অকাল ডুবির ঝুঁকিতে পড়বে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা।


শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *