
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ শেষ হলে বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজারে বাণিজ্য সুবিধা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম)-এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা, বাংলাদেশ–ইইউ বাণিজ্য সম্পর্ক নির্বিঘ্ন রাখা এবং দেশের ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচন এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন নিয়েও কথা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি জাপানের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পন্ন করেছে। এর ফলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে ৭ হাজার ৩০০-এর বেশি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের আলোচনা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ, যাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ দেশটির পণ্যগুলো ভবিষ্যতেও ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “জাপানের সঙ্গে ইপিএ আমাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এটি আমাদের রফতানি পণ্যের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আমরা অবশ্যই ইইউর সঙ্গে একটি এফটিএ স্বাক্ষরের আশা করছি, যাতে আমাদের বাজার আরও সম্প্রসারিত হয়।”
ইউরোচ্যাম চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ তার বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা হারাতে পারে। এ কারণে জরুরি ভিত্তিতে ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একটি এফটিএ ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং উন্নত পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
লোপেজ আরও বলেন, ভারত ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের পথে রয়েছে এবং ভিয়েতনাম এরই মধ্যে এমন চুক্তি করেছে, যার ফলে উভয় মধ্যম আয়ের দেশ ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা একটি এফটিএর পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলছি। আমি ইউরোপে গিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করব।”
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ–ইইউ বাণিজ্যিক সম্পর্কের রূপান্তর ঘটবে, তবে তা ২০২৯ সালের আগে নয়।
তিনি বলেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের একটি বড় বাজার হিসেবে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি আনার ক্ষেত্রে ইইউ গভীর আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৬ সালে একটি ইইউ–বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম আয়োজনের প্রস্তুতির কথাও জানান।
মাইকেল মিলার বলেন, “আমরা চাই প্রাথমিক রাজনৈতিক সংকেত—যাতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো নিশ্চিত হয় যে তারা বাংলাদেশে আসতে উৎসাহ পাবে এবং সমান সুযোগ পাবে।”
প্রধান উপদেষ্টা ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তরের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে দক্ষ জনশক্তির বিশাল ভাণ্ডার থেকে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে।
অধ্যাপক ড. ইউনূস বলেন, “আমরা একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলছি। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ব্যবসার জন্য একটি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা। আমরা বাংলাদেশে আরও ইউরোপীয় বিনিয়োগ চাই।”
আসন্ন সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে আস্থার বড় প্রতিফলন।”
ড. ইউনূস আরও যোগ করেন, নির্বাচন প্রচারণার সামগ্রিক চিত্র “খুবই ইতিবাচক।”
বৈঠকে সরকারের এসডিজি সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদও উপস্থিত ছিলেন।
